তাবলীগ সংকট ও একটি ব্যথিত হৃদয়ের আবেদন


[লিখেছেন #, November 26, 2018 09:26 pm ]

এক.

প্রিয় দায়ি ভাইগণ! গভীরভাবে একটু চিন্তা করুন; কিছু দিন পূর্বেও যে সাথী, এক সাথে, একই প্লেটে আপনার সাথে খাবার খেত, ভাল অংশ আপনার দিকে ঠেলে দিত, আপনার সেবা করতে স্বাচ্ছন্দবোধ করত, আপনিও তার জন্য অনুরূপ। আজকে হৃদয় নিংড়ানো সে অকৃত্রিম ভালবাসা কেন নেই? আজকে কেন একে অন্যের প্রতি শ্রদ্ধাহীন ও বিরূপ মন্তব্যকারী, আল্লাহ না করুন, না জানি এ ভয়ানক পরিস্থিতি আরো ভয়ানক হয়ে যায় কি না
শিক্ষক গড়ার কারিগর, উস্তাযুল আসাতিজা, আল্লামা শিব্বীর আহমদ সাহেব দা.বা. তাঁর প্রতিষ্ঠিত “মারকাযুল উলূম মাদরাসা” র এক এসলাহী জোড়ে অত্যন্ত ভারাক্রান্ত মনে বলেন, “এই মুহর্তে সবাইকে বুক পাঠায় কান্না করা দরকার অবস্থা এরকম হল কেন ? আর বেশি বেশি নিরপেক্ষ দো’আ করতে হবে, আল্লাহ যেন পরিস্থিতি অনুকূল করে দেয় এবং সবাইকে হক বুঝার তাওফীক দেয়” আমীন!
দুই.
প্রিয় দাঈ বন্ধুগণ!
মাওলানা ইলিয়াছ রহ. এর রেখে যাওয়া আমানতের সাথে আমার মহব্বতের সম্পর্ক থাকলেও মেজাজ বানিয়ে মেহনত করা প্রায় শূণ্যের ঘরে। দাওয়াত ও তাবলিগের যে কোন প্রোগ্রাম সাধারণত উরদু-আরবী পরিভাষা ব্যবহারের মাধ্যমে হয়ে থাকে। সে ধারাবাহিকতায় শুরু হয় ওয়াজাহাতী জোড়। আর এর সিংহভাগ আলোচনা হয় ব্যক্তি কেন্দ্রীক। যা সম্পূর্ণ তাবলিগের উসূলের বিপরিত! এই আলোচনার বৈধতার ব্যাপারে সম্মিলিত ওলামায়ে কেরামের মতের বাহিরে ভিন্ন মতের হিম্মত নেই। কিন্তু তাবলিগের প্রায় অতিত একশত বছরের দিনগুলোতে এই ওয়াজাহাতী জোড়ের অস্তিত্ব বা প্রয়োজনিয়তা কি ছিল? তা আমার জানা নেই।
তবে নোয়াখালী জেলার অন্তর্গত চৌমুহনী মারকাযের কথা মনে পড়ে। সেখানে কেরানী সাহেব রহ. নামে একজন বুযুর্গ দাঈ ছিলেন। যাকে কেউ কেউ নোয়াখালীর তাবলিগের বানী বলেও মনে করেন। এই আল্লাহর বান্দা দাওয়াতী কাজ করতে গিয়ে জীবনের এক পর্যায়ে কাজের নিয়মাবলী ও কাকরাইল মারকায থেকে সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে। চৌমুহনী মারকাযে খুরুজ ইত্যাদি তার নিজস্ব চিন্তাধারায় চলতে থাকে। এভাবে তার জীবন এবং তার ছেলের জীবন প্রায় শেষ হয় কাকরাইলের সাথে সম্পর্ক বিচ্ছিন্ন থাকার মধ্য দিয়ে।
কই সেদিন তো কোন ওয়াজাহাতী জোড় করা হয় নাই। মসজিদ থেকে বাহির করার সিদ্ধান্ত দেওয়া হয় নাই। বরং দীর্ঘ সময় পর্যন্ত তাবলিগের মূল ধারা থেকে সরে নিজস্ব গতিতে চলতে থাকে। মসজিদ থেকে বাহির করে দেওয়া লাঠিয়ালি সিদ্ধান্ত ছিল না! এই সিদ্ধান্তের ফলে দিন দিন লাঠিয়ালিই যে বেড়ে চলছে সারা দেশের অবস্থা তার জ্বলন্ত প্রমাণ। হয়ত কোথাও কোথাও জয়-পরাজয়ের খোজ পাওয়া গেলেও মীমাংসাতো মোটেও হচ্ছে না। সাথে সাথে তাবলিগ ও তাবলিগের ধারকবাহকগণ প্রশাসন থেকে আরম্ভ করে সর্ব স্তরের মানুষের আস্থা হারিয়ে আস্তোকুড়ে নিক্ষিপ্ত হওয়ার প্রায় দার প্রান্তে।
দাওয়াত আজ বড়ই মজলূম! এবং মজলূমের আকুতি কবূল হয়। জালেম কে? আল্লাহই ভাল জানে।আল্লাহ জালেমের হাত থেকে মজলূমকে নাজাত দিন। আমীন!

তিন.
নিজামুদ্দীন মারকায ও মাওলানা সাআদ হাফিজাহুল্লাহ এর ইতা’আত!!
আল্লাহ তা’আলা ইরশাদ করেন: হে মু’মিনগণ! তোমরা আল্লাহ, রাসূল এবং উলুলআমরের ইতা’আত কর। উলুলআমরের যে কয়টি ব্যাখ্যা রয়েছে তন্মধ্য থেকে একটি হচ্ছে ‍‍জুমহুরে ওলামায়ে কেরাম। অর্থাত তোমরা ওলামাগণের সম্মিলিত সিদ্ধান্তের অনুস্মরণ কর। কোন কাজ ইতা’আত আর কোন কাজ মা’সিঅত (গুনাহ) ইহাতো কুরআন সুন্নাহর আলোকে ওলামায়ে কেরামই সিদ্ধান্ত দিবে। আশ্চর্যের বিষয় হল; একদিকে নিজের নাম রাখলাম ইতা’আতের জামাত আবার অন্য ভাইয়ের গায়ে হাতও উঠালাম! কারো গায়ে হাত উঠান, গাল-মন্দ করা জঘন্যতম মা’সিঅত (গুনাহ)। উপর্যপরি ইহা বান্দার হকওতো বটে। যা বান্দার ক্ষমা ছাড়া ক্ষমা হবে না। ইতা’আতের সাথে গুনাহের সম্পর্ক হতে পারে না, বরং ছবরের সম্পর্ক, আর ছবরকারির জন্য রয়েছে অগণিত প্রাপ্য। জুমহুর ওলামাদেরকে মন্দ বলা বা তাদের প্রতি মন্দ আকিদা পোষণ করার দ্বারা সিরাতে মুসতাকিম থেকে সরে গিয়ে ভ্রষ্টতায় নিমোজ্জিত হওয়ারও সম্ভাবনা রয়েছে।
আমরা যারা মাওলানা ইলিয়াস রহ. এর রেখে যাওয়া দাওয়াত ও তাবলিগকে মহব্বত করি, এবং ইহা একটি আমল মনে করি। তাদের উচিত ছিল- বিগত বছর বিশ্ব ইজতেমা চলাকালে যখন জুমহুরে ওলামাদের সিদ্ধান্তের বাহিরে কৌশল করে হঠকারিতার সাথে মাওলানা সাআদ হাফিজাহুল্লাহকে নিয়ে আসা হলো, তখন ওলামাদের মুখামুখি করে সাআদ সাহেবকে বসানোর ব্যবস্থা করা এবং ওলামায়ে কেরামের অভিযোগগুলোর ব্যাপারে তাকে সরাসরি জিজ্ঞাসা করা। দেখা গেছে; জুমহুর ওলামাগণ অভিযোগ করেছে আর ইতা’আতের সাথীগণ হঠকারিতা দেখিয়েছে, যা তাবলিগ ও তাবলিগওয়ালাদের মেজাজ বহিরভূত। সুতরাং প্রাথমিক সমাধান ব্যর্থতায় পর্যবসিত হল। এর পরেও উচিত তো ছিল জুমহুর ওলামাদের ইতা’আত করে দাওয়াতের কাজ চালিয়ে যাওয়া। যেমনটি হচ্ছে পাকিস্তানে। সেখানেও ব্যর্থতার শিকার। তাবলিগকে ঢেলে দেওয়া হলো ধ্বংসের দার প্রান্তে।
এর পর শুরু হলো উদ্ভট কত কথা! ঘোষণা হলো নিজামুদ্দীন শূরা নয় বরং নিজামুদ্দীন হলো সারা পৃথিবীর ইমারাত! আশ্চর্য! এই যেন একটি ইসলামী রাষ্ট্র ব্যবস্থা!! এই ইমারাত কি ফরজ? কাজের স্বার্থে সুন্নাত তরিকা হলো কাউকে সামনে রেখে চলা। দারুল কুফরে বসবাসকারী ব্যক্তি কোন দৃষ্টিতে ইমারতের প্রশ্ন নিয়ে এলো? এর চেয়ে অজ্ঞতা আর কী? এমনিতে তাবলিগের মাথায় তাহরিফের গ্লানি পূর্ব থেকেই ছিল, এখন ইমারতের মুকুট নতুন মাত্রা যোগ করল। এসব কী কুরআন হাদিসের ব্যাপারে অজ্ঞতার প্রমাণ নয়? দাওয়াতের কাজ করা আমার দায়িত্ব, তাই বলে আমার ইচ্ছামত কাউকে মানতে হবে, ইহাতো ইতা’আত নয় বরং মা’সিঅত (গুনাহ)-র চিন্তা চেতনা।
পাকিস্তানের সাথীদের কাজের যোগ্যতা সর্ব স্বীকৃত। তারাতো নিজামুদ্দীনের সাথে সম্পর্ক ছাড়া কাজ করছেন। সমস্যা কোথায়? কাজের জন্য জায়গা বা ব্যক্তির অনুস্মরণ কতটুকু প্রয়োজন? মাঠে-ময়দানে কাজ ধ্বংসের দার প্রান্তে, এর পরও কি একটু অনুভূতি জাগ্রত হবে না? বুকটা ভয়ে কেফে উঠবে না? চোখে পানি আসবে না? কার ভক্তিতে কার আমানত ধ্বংস করছি? আল্লাহ কি আমাকে জিজ্ঞাসা করবেন? নিজামুদ্দীন বা সাআদ সাহেবের অনুস্বরণ করে দাওয়াতের কাজ কর নাই কেন? এক প্লেটের সাথী এখন তাকে পাকিস্তানী বলি! লজ্জাওতো থাকা উচিত।
শেষ কথা: ভাই প্রশাসনের বারান্দায় গিয়ে তাবলিগকে আর ঘৃণিত করবেন না। কারো গায়ে হাত উঠাবেন না। ইহাতো ইতা’আত নয় বরং জঘন্যতম মা’সিঅত (গুনাহ)। ওলামাদেরকে গালি দিলে ঈমান নষ্ট হবে, যে ঈমানের জন্য তাবলিগের মেহনত। মনে রাখতে হবে নিজামুদ্দীন দারুল কুফরের একটি জায়গা। যখন ভাল ছিল তখন অনুস্মরণ করা হতো। এখন সমস্যা তাই ভিন্ন চিন্তা করতে হবে। তাবলিগের অবিস্মরনীয় শিক্ষা; কিছু থেকে কিছু হয় না, এখন সব কিছু দারগা, পুলিশ, সন্ত্রাস এবং প্রশাসন থেকে হয়! এ কি লজ্জার কথা!! কোথায় একরাম? কোথায় ইখলাছ? কোথায় ইতা’আত? সব যেন হাবিয়ার মার মন্ত্র! আল্লাহ সকলকে ফিকির করার ও হক বুঝবার তাওফিক নসিব করুন। আমীন!

 

হযরত মাও. হাফেজ মোশাররফ হোসাইন
শাইখুল হাদীস ও শিক্ষা সচিব, জামিয়া মিফতাহুল উলূম ধন্যপুর মাদরাসা
মাইজদী সদর, নোয়াখালী