যে কালি কলঙ্কের চেয়েও কালো


[লিখেছেন #, November 29, 2018 11:28 pm ]

– রশীদ জামীল

মানুষটিকে যখন গ্রেফতার করে নির্বাসনে পাঠিয়ে দেওয়া হয়, মুখে তখন ঠিকমতো দাড়িও গজায়নি। পঁচিশ বছর পর যখন ফিরলেন, চুল দাড়ি সব সাদা হয়ে গেছে তাঁর! মানুষটির অপরাধ ছিল, তিনি মা মাটি আর মানুষের সাথে সাথে বেঈমানি করতে চাননি। তাঁর অপরাধ ছিল তিনি ঈমান বিক্রি করতে রাজি হননি। তিনি ছিলেন মাওলানা উবায়দুল্লাহ সিন্দী।

প্রচণ্ড শক্তিশালী একটি কলম ছিল তাঁর। বন্দী করে নিক্ষেপ করাহল কারাগারে। তিন বছরের মাথায় স্ত্রী মারা গেলেন। স্ত্রীকে শেষ নজর দেখবার জন্য তাঁকে তিন দিনের প্যারোলো মুক্তির আদেশ দেওয়া হল। তিনি আদেশ নামার উল্টোপিটে লিখে দিলেন ‘আমি তোমাদের করুণা চাই না। কেয়ামতের মাঠেই আমি আমার স্ত্রীর সাথে সাক্ষাত করে নেব’। তিনি ছিলেন মাওলানা আবুল কালাম আযাদ।

দিনের পর মাস নির্যাতিত হতে থাকলেন কিন্তু আপোষ করতে রাজি হলেন না। যখন শেষ গোসল দেওয়ানো হচ্ছিলো, মৃত্যুর পর, কোমরে কোনো হাড্ডি খুঁজে মিলেনি। বলছি শায়খুল হিন্দের কথা। ইন্তেকালের পর তাঁর শরীরের এই অবস্থা দেখে আতকে ওঠল লোকজন। চোখের পানি মূছতে মুছতে মাওলানা মাদানি বললেন, শায়খ আমাকে নিষেধ করেছিলেন বলে এতোদিন কথাটি আমি প্রকাশ করিনি। যখন জেলে ছিলেন, ইংরেজরা তাঁকে তাদের পক্ষে বিবৃতি দেওয়ার জন্য চাপ দিত। তিনি রাজি হতেন না বলে মারপিট করত। বসিয়ে রাখা হত বাথরুমের কমোডে, ঘণ্টার পর ঘণ্টা, দিনের পর দিন। সেখানেই চলতো অত্যাচার। তবুও তিনি আপোষ করতে রাজি হতেন না। তারা লোহার বেড়িয়া আগুনে পুড়িয়ে লাল করে কোমরে পরিয়ে দিত। যন্ত্রণায় কুকড়ে যেতেন আমার শায়খ। তবুও জায়গা থেকে নড়তেন না। কোমরের মাংস জ্বলে পুড়ে হাড্ডিতে গিয়ে লাগত, তবুও।

শায়খুল হিন্দের বিশ্বস্থ আস্থাভাজন মাওলানা মাদানি। শায়খের সাথে স্বেচ্ছা কারাবরণ করেছিলেন তিনি। আমার শায়খ জেলে যাবেন আর আমি বাইরে থাকব; হতেই পারে না। শায়খের পর তিনি যখন ফ্রন্ট লাইনে এলেন, গ্রেফতার করাহল তাঁকেও। বলাহল, আমাদের পক্ষে বিবৃতি দাও। তিনি রাজি হলেন না। আদালতের কাঁঠগড়ায় দাঁড়িয়ে হুংকার ছুড়লেন, ফতওয়া দিয়া তো কিয়া হোয়া! আজভি মেরি ইহি কেহনাহে কে, ইংরেজকে ফৌজমে শিরকত করনা হারামহে।

মাওলানা জাফর থানেশ্বরী’র ফাঁসির আদেশ দেওয়া হল। আম্বালা কারাগার থেকে তাকে স্থানান্তর করে নিয়ে যাওয়া হয় লাহোর কারাগারে। সঙ্গে আরো কয়েকজন আলেম। হাতে হাতকড়ি, পায়ে বেড়ী, কোমরে বেড়ি। তাদের জন্য তৈরি করা হল বিশেষ পিঞ্জিরা। তাদের হাত থেকে রক্ত ঝরছে, রক্তে ভেসে যাচ্ছে জমীন, এরই মধ্যে তাদের ঢুকিয়ে দেওয়া হল পিঞ্জিরায়। আবার সেই সংকীর্ণ পিঞ্জিরার ভেতর দিক ছিল ধারালো এবং সুঁচালো। ফলে নড়াচড়া পর্যন্ত করতে পারছিলেন না তাঁরা। আলেম ভর্তি ওসব পিঞ্জিরা উঠিয়ে দেওয়া হল ট্রেনের বগিতে। ফাঁসি কার্যকর করা হবে মুলতান ডিষ্ট্রিক জেলে।

তিন মাসে ট্রেনটি লাহোর থেকে গিয়ে পৌঁছালো মুলতানে। তাদের জানানো হল, আগামীকাল ভোরে তোমাদের ফাঁসি কার্যকর করা হবে। খুশিমনে রাত কাঠালেন তাঁরা। তাঁদের চেহারায় আনন্দের ঝিলিক। ভোরবেলা তাঁদের হাসিমাখা মুখ দেখে সাদা চামড়ার উল্লুক প্রশ্ন করল, ‘কী ব্যাপার! ফাঁসি মানে তো মারা যাওয়া। সুন্দর এই পৃথিবী থেকে চিরদিনের জন্য চলে যাওয়া। এটাতো কোন খুশির বিষয় হতে পারে না। তবুও তোমরা এত আনন্দিত! ব্যাপার কী’?

মাওলানা থানেশ্বরী হাসিমুখে জবাব দিলেন, ‘আমরা বড়ই গুনাহগার। আমরা যদি স্বাভাবিকভাবে মারা যেতাম, তাহলে আল্লাহর কাছে ক্ষমা পাবার সম্ভাবনা ছিল, সম্ভাবনা ছিল ক্ষমা না পাবারও। কিন্তু আমাদেরতো ফাঁসি হবে। আমরা শহিদ হয়ে যাব। সরাসরি চলে যাব হাইজে কাওসারের পাড়ে। ওখানে দাঁড়িয়ে আছেন আমাদের প্রিয়নবী। আমরা চলে যাব তাঁর কাছাকাছি। এরচে’ বড় খুশির ব্যাপার আর কী হতে পারে’?

পাষণ্ড ইংরেজ তখন বলে উঠল, ‘মৌলভী! যে মৃত্যু পেলে তোমরা খুশি হও, তেমন মৃত্যুও তোমাদের দেওয়া হবে না। তোমাদের ফাঁঁিসর আদেশ বাতিল করা হল। তোমাদের পাঠিয়ে দেওয়া হবে জীবন এবং মৃত্যুর মাঝামাঝি। তোমরা ভালোকরে বাঁচতেও পারবে না আবার মরতেও পারবে না। ১৪ বছরের জন্য তোমাদের পাঠিয়ে দেওয়া হবে কালাপানির নির্জন দ্বীপে’।

… কতজনের কথা বলব? রক্তরাঙা সেই ইতিহাসের কতটুকুইবা তুলে ধরা যায়? যে কয়েকজনের কথা বললাম, আরো যারা, সতেরশ’ সাতান্ন থেকে আটারশ’ ছে’ছট্টি হয়ে ঊনিশশ সাতচল্লিশ পর্যন্ত অধিকাংশ রাতগুলো যাদের ঘুমহীন কাটলো, যাদের দিন কাটল ঘামের পানিতে পীঠের ছাল ভিঝিয়ে, রাত কাটলো চোখের পানিতে গাল ভিজিয়ে, মাথার ঘাম পায়ে ফেললেন যারা; আমরা একটু মাথা উঁচু করে বাঁচব বলে, ঈমান নিয়ে থাকব বলে, অধিকার নিয়ে চলব বলে, তাঁরা যদি আমাদের আকাবির হয়ে থাকেন, তাঁদের মাসলাক ও মানহাজই যদি আমাদের জন্য অনুস্মরণীয় হয়ে থাকে, তাহলে তাঁরা কোথায় আর আমরা কোথায়?
বর্তমান অবস্থা কি তখন থেকেও খারাপ?
এখনকার সময় কি তখন থেকে আরোবেশি মারাত্নক?
তখন তো আলেমদের ধরে ধরে প্রকাশ্যে গাছের সাথে ঝুলিয়ে হত্যা করে ফেলা হচ্ছিলো। এখন কি অবস্থা তারচেও ভয়াবহ? যদি না হয়, তাহলে অবস্থা, সিচুয়েশন, চাপ, মুসলিহত… কী বোঝানোর চেষ্টা করাহয় আমাদের?

দুই
ভোটের মাঠে একবার আসন হারালে পরেরবার হারানো আসন ফিরিয়ে আনা যায়। পরীক্ষায় একবার ফেইল করলে পরেরবার পাশ করার আশা থাকে। কিন্তু একবার ঠিকমতো ইজ্জত হারিয়ে ফেলতে পারলে সেটা আর কখনও ফিরিয়ে আনা যায় না। আজকে যারা নির্ল্যজ্জের মতো, এবং অবশ্যই বেহায়া নির্লজ্যের মতো আওয়ামীলীগ বিএনপির দয়ার জন্য পা’জামা খুলে ছোটাছুটি করছেন, তাদের কেউ দিয়া ভিক্ষা পেলেন কি পেলেন না, কেউ বা কেউ কেউ পানও যদি, তিনি পাশ করতে পারলেন কি পারলেন না; তারচেও বড় ব্যাপার হল, তারা যে একটি সম্ভাবনাময় জনগোষ্ঠীর কপালে কলংকের তিলক লেপে দিয়ে যাচ্ছেন, যে কালি কলঙ্কের চেয়েও কালো, সেটা আমরা মুছব কেমন করে? কত বছরে?

কেউ এখানে এসে ইতিহাস কপচানোর চেষ্টা না করাই ভালো। সেগুলো আমরা একটু আধটু জানি। আলেম-উলামা এর আগেও নির্বাচনী জোট করেছেন। লাঙ্গল/নৌকা/ধানের শীষ নিয়ে লড়েছেন। কিন্তু এবারের মতো সর্বস্ব বিলিয়ে দেননি। নিজেদের নিজস্বতা ঠিক রেখে মাথা উঁচু করেই ছিলেন।

তিন
আজকাল যখন বলতে শুনি, ‘অবস্থা ভাল না, সময় খারাপ, অনেক চাপে পড়ে অনেক কিছু করতে হচ্ছে’… তখন ইচ্ছাকরে তাদের পায়ে ধরে অনুরোধ করি তাঁরা যেন এভাবে আর না বলেন। কারণ, যদি এভাবেই বলতে থাকেন এবং বলার মতো চলতে থাকেন, তাহলে সেইদিন মনেহয় আর বেশি দূরে নয়, যেদিন বাংলাদেশের লক্ষ লক্ষ কওমি ছেলেরা বলে বসতে পারে, ‘মাফ চাই, দোয়াও চাই। থাকুন আপনারা আপনাদের মতো। আমরা তাদের কাছেই ফিরে যাচ্ছি, সেই আকাবিরদের কাছে, যাদের কথা আপনারা বলেন’।

হয়ত বলতে পারে, আপনারা জেলে যাওয়ার ভয়ে সত্য বলতে সাহস পান না। আমরা ফিরে যাব তাদের দিকে, যারা ফাসির দড়ি চোখের সামনে ঝুলতে দেখেও সত্য থেকে এক ইঞ্চিও পিছিয়ে আসেননি।

হয়ত বলতে পারে, আপনারা ক্ষমতার একটুকরো শুটকির গন্ধে বিভোর হয়ে যান। আমরা তবে ফিরে যাচ্ছি তাদের দিকে, যারা অর্থ, ক্ষমতা এবং প্রতিপত্তির অফারকে পায়ের নখের টোকায় উড়িয়ে দিয়েও নীতির প্রশ্নে অটল থেকেছেন।

ভালো কথা। আমাদেরকে বারবার একথাও মনে করিয়ে দেওয়ার দরকার নেই কে কী, কার বাবা কে অথবা কে কার খলিফা। আমরা জানি নূহ আলাইসিহ সালামের ঘরেও কেনানের জন্ম হয়েছিল। আমরা জানি মুহাম্মাদুর রাসুলুল্লাহর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের খলিফাদের ভেতরেই মিশে থাকতো আব্দুল্লাই ইবনে উবাই ইবনে সুলুল। সুতরাং, বৃক্ষ তোমার নাম কী, ফলে পরিচয়।

চার
আনন্দ বেদনার এই কাব্যিক সময়ে সান্ত্বনা হল কওমি প্রজন্ম, যারা এতোদিন বিশ্বাসের কাঁচামাল ছিল, জাগতে শিখেছে। তাঁরা এখন সাদা এবং কালোর তফাত করতে শিখেছে। এখন তাঁরা কথা বলতেও শিখেছে। এই প্রথম তাঁরা বুঝতে পেরেছে চোখ-কান বন্ধ করে বড়দের আদেশ শুনেই ‘জ্বি আচ্ছা’ বলে যাওয়ার নাম আনুগত্য নয়। প্রকৃত আনুগত্য হচ্ছে কোনটা বড়দের কথা এবং কোনটা বড়দের নাম ভাঙানো কথা, সেটা খতিয়ে দেখা। তাঁরা বুঝতে শিখেছে বড়দের নাম ব্যবহার করে কেউ ধান্ধার ফন্দি করলে তাদের বিরুদ্ধে কঠিন প্রতিরোধ গড়ে তুলে বড়দেরকে চামচামুক্ত করার নাম প্রকৃত আনুগত্য। প্রজন্মের মাথা বিক্রি করে কেউ যদি তোয়াজের ডুগডুগি বাজাতে চায়, তাহলে তাদেরকে অবাঞ্চিত ঘোষণা করার নাম প্রকৃত আনুগত্য। চেতনাটি বেঁচে থাকা দরকার।

সদ্য-সম্প্রতি শুকরানা মাহফিলকে কেন্দ্রকরে ছোটরা বড়দেরকে যে ম্যাসেজটি দিল, আমি জানি না সেটি তাঁরা ঠিকমতো রিড করতে পেরেছেন কিনা। যদি পেরে থাকেন, তাহলে তো ভালো। বাকি দিনগুলো মোটামুটি ইজ্জত নিয়ে বাঁচতে পারলেন। আর যদি, ম্যাসেজটি যদি পড়তে না পারেন, অথবা ইগনোর করেন, তাহলে তাদের জন্য সামনের দিনে পদে পদে অপমান এবং লাঞ্ছনার আগাম সুসংবাদ থাকল।

                                                                                                                               সংগ্রহে

                                                                                                                                কাউছার আহম্মাদ
                                                                                                                              মাইজদী, নোয়াখালী