রাজনীতিতে ওলামা-নেতৃত্বের প্রতি জনগণের আস্থা- ছগীর চৌধুরী


[লিখেছেন ., September 6, 2018 05:04 pm ]

রাজনীতিতে ওলামা-নেতৃত্বের প্রতি জনগণের আস্থা

ওলামানেতৃত্বের অপরিহার্যতাবাদ দল ও দেশ উভয়ের জন্য ক্ষতিকর। অন্যদিকে ওলামাবান্ধব নেতৃত্ব দলীয়ভাবে ততোটা ক্ষতিকর না হলেও জাতীয়ভাবে এটি খুব যে জনপ্রিয় হতে পারেনি তার ছোট্ট একটি উদাহরণ এখানে পেশ করছি নিজের অভিজ্ঞতা থেকে। কিছুটা ছোট ছিলাম তখন, বাল্যবয়সের কচি মনে একটি ঘটনা এখনো রেখাপাত করে আছে। সালটা ছিল ১৯৯৬, চট্টগ্রাম-১৫ বাঁশখালী সংসদীয় আসনে মুফতী ইজহারুল ইসলাম চৌধুরী নির্বাচন করছিলেন। আমাদের পুরো পরিবার তাঁর নির্বাচনে কায়িক খেটেছিল। একদিন আমাদের বাড়িতে এলাকার গণ্যমান্য কয়েকজন ব্যক্তি ও স্থানীয় মেম্বার আসেন। আমার বড় ভাই তাঁদের সকলকে মিনার প্রতীকে ভোট দেওয়ার অনুরোধ করেন। বড় ভাই মাওলানা আনিস আহমদ চৌধুরীও এলাকার একজন্য বরেণ্য ব্যক্তি, বিচার-সালিশে তাঁর অনেক গ্রহণযোগ্যতা। সে হিসেবে তাঁর অনুরোধে মিনার প্রতীকে ভোট দেবেন বলে আশ্বস্ত করেন। কিন্তু তাঁরা এও বলেন যে, মুফতী সাহেব সম্ভ্রান্ত পরিবারের সন্তান, খান বাহাদুর বদি আহমদ চৌধুরীর ভাতিজা (সাবেক মন্ত্রী মাহমুদুল ইসলাম চৌধুরীর পিতা) এবং কাজী সাহেবের সন্তান, বরেণ্য আলেম, গুণী ব্যক্তি—সবই ঠিক আছে। তবে রাজনীতি তাঁর যোগ্যতার বিষয় নয়। রোড-ঘাট মেরামত, রাস্তা-কালভার্ট নির্মাণ, চোর-ডাকাত-সন্ত্রাসদের সামলানো ইত্যাদি তাঁর পক্ষে সম্ভব নয়। তিনি পারবেন না এসব, তিনি মুফতী সাহেব মানুষ, সেটিই তাঁর কাজ।

আমি মেনেই নিতে পারছিলাম না যে, মাহমুদুল ইসলাম চৌধুরীর কি এমন আছে যা মুফতী ইজহারের নেই? কেন রাজনীতি তাঁর যোগ্যতার বিষয় নয়? বড়দের সামনে সেই সোয়াল পেশ করিনি, তবে ব্যাপারটি আমার হৃদয়ে এতোটা আঘাত এবং দাগ কেটেছিল যে, এ-ঘটনা আমার এখনো মনে পড়ে এবং এর উত্তর আমি এখনো খুঁজে বেড়াই। এর উত্তর যাই হোক, আমি যেটি বুঝেছি তা হচ্ছে, রাজনীতিতে ওলামানেতৃত্বের প্রতি জনগণের আস্থা-বিশ্বাস ও ভরসা কিছুই নেই। তারা ওলামায়ে কেরামকে রাজনীতিক নেতৃত্বের জন্য যোগ্য মনে করে না। ইসলামি দলসমূহ যে নির্বাচনে বারবার ফিল করছে তার অন্যতম কারণ হচ্ছে, জনগণের চাহিদা ও তাদের পছন্দ বুঝতে না পারা। প্রশ্ন হচ্ছে জনগণের যা পছন্দ তাকে ইসলামের স্বার্থে কাজে লাগানো উচিত? নাকি নিজেরা যা পছন্দ করি তা-ই জনগণের ওপর চাপিয়ে দেওয়ার ব্যর্থ প্রয়াস চালানো উচিত? কোনটি গুরুত্বপূর্ণ? কোনটি ইসলামের স্বার্থের সাথে যুক্তিযুক্ত? আমি মনে করি জনগণের চাহিদা ও পছন্দকে গুরুত্ব দেওয়া উচিত।

আর ইসলামি দলসমূহে জনপ্রতিনিধি পদে প্রার্থিতা বাছাইয়ের যে-প্রক্রিয়া সেটিও জনবান্ধব নয়। অধিকাংশ দলে সাংগঠনিক স্তরের কাঠামো রয়েছে, নির্দিষ্ট স্তরে পরিপূর্ণ উন্নীত না হলে কারো পক্ষে নির্বাচনে অংশগ্রহণ সম্ভব নয় এখানে। এর অর্থ হচ্ছে, ইসলামি দলসমূহের রাজনীতি মোটেও গণমুখী নয়, এদের রাজনীতি সম্পূর্ণ দলমুখী। অথচ জননেতৃত্ব ওঠে আসে গণমুখী রাজনীতি থেকে, কোনো দলের পরিকল্পনা অনুযায়ী এই ধরনের নেতৃত্ব সৃষ্টি হয় না। আর গণমুখী রাজনীতিতে নেতৃত্বের ইহজাগতিক যোগ্যতাই মুখ্য, এটাই জন-আর্কষণের কেন্দ্রবিন্দু। সেখানে ব্যক্তিত্বের ধর্মীয় মর্যাদা, মহত্ত্ব ও ফযীলত খুব একটা কাজে আসে না। প্রার্থিতা বাচাইয়ের ক্ষেত্রে গণ-আকর্ষণের এ-ব্যাপারটি একেবারেই উপেক্ষা করা হয় প্রায় সকল ইসলামি দলে। আবশ্যিকভাবে ওলামা-নেতৃত্বের প্রার্থিতা জনগণের ওপর চাপিয়ে দেওয়া, যথাযোগ্যতা-সম্পন্ন প্রার্থীর সংকট এবং জনবিচ্ছিন্ন প্রার্থিতার কারণে ইসলামি দলগুলো ভোটের রাজনীতিতে অনেক পিছিয়ে। স্বাধীন বাংলাদেশে জাতীয় নির্বাচনসমূহে অংশগ্রহণকারী ইসলামী দলসমূহের সম্মিলিত ভোটের যে-যোগফল তাতে এটা স্পষ্ট যে, বাংলাদেশর ভোটের রাজনীতিতে ইসলামি দলসমূহের অবস্থান খুবই দুর্বল।

পরিসংখ্যান বলছে, ‘১৯৭৯ সালের দ্বিতীয় সংসদ নির্বাচনে গণতান্ত্রিক ইসলামিক ফ্রন্ট শতকরা ১০.০৭ ভাগ ভোট পায় (২০ আসন)। খান এ সবুরের মুসলিম লীগ ও মাওলানা আবদুর রহীমের ইসলামিক ডেমোক্রেটিক লীগ (যা পরে জামায়াতে ইসলামী নামে আত্মপ্রকাশ করে) জোটবদ্ধ হয়ে গণতান্ত্রিক ইসলামিক ফ্রন্ট নামে আত্মপ্রকাশ করেছিল। ১৯৮১ সালের রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে উলামা ফ্রন্টের প্রার্থী ছিলেন হাফেজ্জী হুজুর (ভোট পেয়েছিলেন ১ দশমিক ৭৯ ভাগ। বিজয়ী বিএনপির আবদুস সাত্তার পেয়েছিলেন ৬৫ দশমিক ৮০ ভাগ ভোট)। ১৯৮৬ সালের তৃতীয় জাতীয় সংসদ নির্বাচনে জামায়াতে ইসলামী পেয়েছিল ১০ আসন ও ৪ দশমিক ৬১ ভাগ ভোট। বিএনপি নির্বাচন বর্জন করেছিল (আওয়ামী লীগ ৭৬ আসন ও ২৬ দশমিক ১৫ ভাগ ভোট)। চতুর্থ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে (১৯৮৮) বড় দলগুলো অংশ নেয়নি। ১৯৯১ সালে ৫ম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে জামায়াতে ইসলামী ১৮ আসন (১২ দশমিক ১৩ ভাগ ভোট), ১৯৯৬ সালে ৭ম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে জামায়াতে ইসলামী ৩ আসন (৮ দশমিক ৬১ ভাগ ভোট) ও ইসলামী ঐক্যজোট ১ আসন (১ দশমিক ০৯ ভাগ ভোট), ২০০১ সালে অনুষ্ঠিত ৮ম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে জামায়াতে ইসলামী ১৭ আসন (৪ দশমিক ২৮ ভাগ ভোট) ও ইসলামী ঐক্যজোট ২ আসন (শূন্য দশমিক ৬৮ ভাগ ভোট), ইসলামী জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট ১৪ আসন (সবই জাতীয় পার্টির, ৭ দশমিক ২৫ ভাগ ভোট), ২০০৮ সালের ৯ম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে জামায়াতে ইসলামী ২ আসন (৪ দশমিক ৬ ভাগ ভোট), ইসলামী ঐক্যজোট মাত্র ০.১৬ ভাগ ভোট পেয়েছিল। আর ভোটারবিহীন ১০ম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে (২০১৪) ইসলাম-পছন্দ তরিকত ফেডারেশন পেয়েছিল ২ আসন।’ (ড. তারেক শামসুর রেহমানের নিবন্ধ: ইসলামিক সংগঠনগুলো কেন গুরুত্ব পাচ্ছে, আমাদের সময়, ১৯ এপ্রিল, ২০১৭)

উপর্যুক্ত পরিসংখ্যান পর্যালোচনা করে একথা জোর দিয়েই বলা যায় যে, ইসলামি দলগুলোর প্রাপ্ত ভোটের যে হার, এটি একান্তই তাদের কর্মি, অনুসারী ও কিছুকিছু ক্ষেত্রে সমর্থকদের। এছাড়া সাধারণ ভোটারদের নাগাল এখনও ইসলামি দলসমূহের আয়ত্বের বাইরে। জনসাধারণের কাছে এখনো কোনো দলই পৌঁছাতে পারেনি এবং ভোটের রাজনীতিতে শক্ত কোনো গণভিত্তিও ইসলামপন্থিরা তৈরি করতে পারেনি। এই না-পারার পেছনে যেসব কারণ রয়েছে তার মধ্যে প্রার্থিতার ক্ষেত্রে আবশ্যিকভাবে ধর্মীয় নেতৃত্ব চাপানোর অহেতুক চেষ্টা অন্যতম অথবা যথাযোগ্যতা সম্পন্ন প্রার্থীর সংকট বা জনবিচ্ছন্ন প্রার্থিতা। ইহজাগতিক যোগ্যতাসম্পন্ন, জনসম্পৃক্ত, সুপরিচিত, বরেণ্য ও প্রভাবশালী, যিনি তাঁর ব্যক্তিইমেইজ ও গ্রহণযোগ্যতাগুণে বিজয়ী হয়ে আসতে পারবেন প্রার্থী বাচাইয়ে এমন ব্যক্তিবর্গকে গুরুত্ব দিতে হবে। তিনি সংগঠনের নির্দিষ্ট স্তর উত্তীর্ণ করুন বা না করুন, দলে প্রবীন হোন বা নবীন, এমনকি তিনি দলনিরপেক্ষ হলেও তাঁকে বিবেচনা করা যেতে পারে। যদি তিনি আগ্রহী হন, যদি তিনি সৎ হন, নীতি-নৈতিকতার দিক থেকে আদর্শবান হন। বস্তুত এ ধরনের প্রার্থিতার গভীর সংকট রয়েছে ইসলামি দলসমূহে।

২৫ জুলাই ২০১৮ পাকিস্তানের জাতীয় নির্বাচনে প্রতিনিধিত্বশীল বৃহত্তর ওলামায়ে কেরামের নেতৃত্বাধীন ইসলামপন্থি জোট মজলিসে মুত্তাহিদা আমলের ভরাডুবি হয়েছে। ২০০২ সালের নির্বাচনের প্রাক্কালে গঠিত এ জোট ওই নির্বাচনে ৬৩টি আসন লাভ করেছিল। পরবর্তী নির্বাচনসমূহে এ-জোটের শরীকরা বিচ্ছিন্নভাবে নির্বাচনে অংশ প্রায় পঞ্চাশের কাছাকাছি আসনে জিতে এসেছিল। কিন্তু এবারের নির্বাচনে জোটগতভাবে নির্বাচনে লড়াই করেও ১১টির বেশি আসনে বিজয় লাভ করতে পারেনি। নির্বাচনের প্রাক্কালে জোটের পুনর্গঠন, চমকপ্রদ নির্বাচনী ইশতিহার ও ব্যাপক প্রচারণায় আলোড়ন তুলেছে এবং অতীতের যেকোনো সময়ের চেয়ে অনেক বেশি ধর্মীয় ভাবাবেগ সৃষ্টিতে সক্ষম হয়েছিল এই জোট। কিন্তু আখিরে পাক জনগণ এই ওলামানেতৃত্বকে শাসক হিসেবে বেঁচে নেননি, রাষ্ট্রপরিচালনার মতো কাজের জন্য তারা ওলামায়ে কেরামের ওপর আস্থা রাখতে পারেননি এবং তারা এ-কাজে ওলামায়ে কেরামের যোগ্যতায় বিশ্বাস করতে পারেননি। তারা বেঁচে নিয়েছেন একজন সাবেক ক্রিকেট অধিনায়ককে, যাকে সাধারণ ইসলামি শিক্ষায় শিক্ষিত বলা তো চলেই না, বরং ইসলামের মৌলিক বিষয়ে তার নূন্যতম ধারণাও নেই, ইসলামি অনুশাসনের কথা বিবেচনা করলে তাকে আমরা ফাসিক আখ্যা দিতে পারি—দেশ শাসনের জন্য পাকিস্তানের জনগণ ওলামানেতৃত্বের পরিবর্তে তাকেই অধিক যোগ্য বলে বিবেচনা করেছেন। কিন্তু কেন, এর কারণ কী?

এর পেছনে রয়েছে এক কঠিন বাস্তবতা। ওলামানেতৃত্ব হচ্ছে আদতেই দুর্বল, ভঙ্গুর এবং এক অসংহত নেতৃত্ব। ওলামানেনতৃত্বের মাঝে ব্যক্তির ইলমি যোগ্যতা নিয়ে আত্ম-অহংবোধ, ইলমি মর্যাদাগত স্তর ও অবস্থান থেকে পদায়িত হওয়ার প্রবণতা, ফিরকাগত বিতর্ক ও ফিকহী বিরোধ ইত্যাদি নানা কারণ রয়েছে, যা ওলামানেতৃত্বের দুর্বলতা, ভঙ্গুরতা ও অসংহতির জন্য দায়ী। যদি আমরা কল্পনা করি যে, পাকিস্তানের সাধারণ নির্বাচনে ওলামায়ে কেরামের জোট মজলিসে মুত্তাহিদা আমল জয় পেয়েছে এবং সরকারও গঠন করেছে। তবে সেই ইসলামপন্থি জোট সরকার স্বল্পসময়ের ব্যবধানেই আপনা থেকে ভেঙে পড়তো। অভ্যন্তরীণ বিরোধের কারণেই সেই সরকার বেশি দিন টিকেতো না। এখানে প্রধান সমস্যা হয়ে দাঁড়াতো কোন ফিরকা-মাযহাবের লোক কে কি মর্যাদাপূর্ণ পদ-মন্ত্রিত্ব পেয়েছে, ব্যক্তির ইলমি যোগ্যতা-পা-িত্য অনুযায়ী পদায়ন হয়েছে কিনা সেটা। ইসলামি আইন বাস্তবায়ন এই জোটের প্রধান অ্যাজেন্ডা, এই অ্যাজেন্ডা বাস্তবায়ন করতে গেলেও বিভিন্ন ফিরকা ও মাযহাবের ব্যাখ্যাগত অবস্থানের মাঝে সমন্বয় সাধন করাও একটা বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়াতো। এসব দ্বন্ধ-প্রতিদ্বন্ধিতার কারণে এমএমএর জোট সরকার বেশি দিন ক্ষমতায় টিকে থাকতে পারতো না।

আর এটা শুধু কল্পনা নয়, এর বাস্তব উদাহরণও আছে। ২০০১ সালে চার দলীয় জোট সরকারের শরীক ইসলামী ঐক্যজোটের ভাঙন এরই একটা নিকৃষ্ট উদাহরণ। সেদিন একটি মন্ত্রিত্বপদ লাভের জের ধরে ওলামানেতৃত্ব দ্বিধাবিভক্ত হয়ে পড়েছিল, মন্ত্রিত্বের পদ কে পাচ্ছেন সেটা নিয়ে দু’জন ইলমি যোগ্যতাসম্পন্ন শায়খের অনুসারীদের মধ্যে বিরোধের সৃষ্টি হয়েছিল। আর এর অপপরিণতিতে গোটা ইসলামী ঐক্যজোটই ভেঙে দু’ভাগে বিভক্ত হয়ে গিয়েছিল। গত ১১ আগস্ট ২০১৮ জাতীয় পার্টি ও খেলাফত মজলিস (শায়খুল হাদীস) নির্বাচনী জোট গঠন করেছে। ঢাকা ডিপ্লোমা ইঞ্জিনিয়ারিং ইউনিস্টিটিউটে জোটগঠনের সম্মেলনে দলের প্রতিষ্ঠাতা শায়খুল হাদীস আল্লামা আজীজুল হক (রহ.)-এর বড় সাহেবযাদা ও দলের মহাসচিব মাওলানা মাহফুযুল হক সাহেব তাঁর বাবার বিরচিত বিখ্যাত সহীহ আল-বুখারীর এক সেট ব্যাখ্যাগ্রন্থ উপহার দেন জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান হুসাইন মুহাম্মদ এরশাদকে। এরশাদ সাহেবকে উপহার প্রদান, তাঁর প্রতি সম্মান প্রদর্শন এবং তাঁকে বরণ করে নেওয়ার এই ব্যাপারটা আলেমদের পক্ষে অনেক সহজ। কিন্তু একটি ওলামাপক্ষে অন্য পক্ষের ওলামায়ে কেরামকে এভাবে বরণ করে নেওয়া যায় না, সেটি তাঁদের আত্মসম্মানে বাঁধে, তা নিজেদের ইলমি মর্যাদাগত অবস্থানের সাথে সাংঘর্ষিকবোধ হয় এবং নিজেকে অন্যদের চেয়ে বড় জ্ঞান করা হয়।

অর্থাৎ ওলামায়ে কেরাম এরশাদের মতো বস্তুবাদী নেতাদের সামনে নিজেদেরকে ছোটজ্ঞান করেন এবং তাদের সম্মুখে নিজেদেরকে বিলিয়ে দেন। পক্ষান্তরে স্বজাতীয় আলিমদের অন্য পক্ষের সামনে নিজেকে সবচেয়ে বড় হিসেবে উপস্থাপন করেন এবং তাঁদের সামনে চুলপরিমাণ স্বার্থত্যাগেও রাজি হতে পারেন না। ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ দলীয় শক্তি, তৃণমূল পর্যায়ে সাংগঠনিক বিস্তৃতি, এমনকি ভোটের হিসেবেও জাতীয় পার্টির ওপর অবস্থান করছে বলে আমার বিশ্বাস। এখানে ইসলামী আন্দোলনের নেতৃত্বেই ইসলামপন্থিদের জোট হওয়া অধিক মাননসই ছিল। কিন্তু এক্ষেত্রে যারা এরশাদ সাহেবকে গুরুত্ব দিয়েছেন, তাঁরা চরমোনাইয়ের পীর সাহেবকে মেনেও নিতে পারেন না। এরশাদ সাহেবের সামনে তাঁরা নিজেদেরকে ছোটজ্ঞান করেন বটে, কিন্তু পীর সাহেব চরমোনাইয়ের সামনে তাঁরা নিজেদেরকে পীর সাহেবের চেয়ে জ্ঞানী-গুণী-পণ্ডিত ব্যক্তি মনে করেন এবং নিজেদেরকে আলেম হিসেবে অনেক বড়, দীনী দরসে-তাদরীসে সিনিয়র উস্তাদ বা বড় মাদরাসার শায়খুল হাদীস ও মুহতামিম হিসেবে অধিক মর্যাদাশীল ভাবতে থাকেন। আমি মনে করি, ওলামায়ে কেরামের মাঝে ইলমি মর্যাদাগত যে অংহবোধ রয়েছে সেটাই ওলামানেতৃত্বের দুর্বলতার মূল কারণ।

কাজেই পাকিস্তানের জনগণ একদম সংগতকারণে এমন একটা দুর্বল নেতৃত্বের পরিবর্তে একক নেতৃত্ব হিসেবে কথিত ফাসিক ক্রিকেটার ইমরান খানকেই বেঁচে নিয়েছেন। এখানে বরং পাকিস্তানের জনগণ দেশের স্বার্থ বিবেচনায় দূরদর্শিতা, বিচক্ষণতা ও প্রজ্ঞার পরিচয় দিয়েছেন। জনগণের এই চয়েচবোধ যে দোষণীয় নয় তা ইমাম আহমদ ইবনে হাম্বল (রহ.)-এর একটি বক্তব্য দ্বারাও সমর্থিত। ইমাম ইবনে হাম্বল (রহ.)-কে জিজ্ঞেস করা হয়েছিল, আমরা যুদ্ধে যাওয়ার সময় কি এমন কারো নেতৃত্বে যাবো যিনি শ্রেষ্ঠ ও শক্তিশালী, কিন্তু পাপী। নাকি এমন কারো নেতৃত্বে যাবো যিনি দুর্বল কিন্তু তাকওয়াবান? ইমাম ইবনে হাম্বল (রহ.) জবাব দিলেন, ‘একজন তাকওয়াবান নেতা যদি দুর্বল হন সেক্ষেত্রে তাকওয়া তার নিজের ব্যাপার। কিন্তু তার দুর্বলতা তার অনুসারীদের জন্য অকল্যাণ বয়ে আসনে। সুতরাং এমন কোনো ব্যক্তির অধীনে থাকো যিনি শক্তিশালী। যদি তিনি পাপীও হয়ে থাকেন, তারপরও তাকে নেতা বানাবে।’

রাজনীতিক নেতৃত্বে ব্যক্তির ধর্মীয় মর্যাদা ও ধর্মীয় ভাবাবেগের কোনো মূল্য নেই। এখানে মানুষের ঝোঁক দুনিয়াবি যোগ্যতার প্রতি। প্রবাদ আছে, الدنيا بالوسائل لا بالفضائل অর্থাৎ দুনিয়া ওয়াসায়েলের নাম, ফযীলতের কোনো মূল্য এখানে নেই। অতএব ফযীলতপূর্ণ নেতৃত্বের চেয়ে ওয়ায়েলসম্পন্ন নেতৃত্বই অধিকতর কার্যকার এতে কোনো সন্দেহ নেই। তবে সেই নেতৃত্ব হতে হবে অবশ্যই ইসলামের মৌলিক জ্ঞানের অধিকারী, ইসলামি মূল্যবোধ সম্পন্ন এবং অপরিহার্যরূপে আমানতদার তথা দুর্নীতিমুক্ত। আর ইসলামি দলসমূহের মৌলিক কাজ ছিল এই ধরনের নেতৃত্ব তৈরির কাজ করা বা প্রচলিত রাজনীতিক নেতৃত্বের মধ্যে ইসলামি জ্ঞান-মূল্যবোধের প্রতি দাওয়াত এবং দুর্নীতির বিরুদ্ধে কঠোর ক্যাম্পেইন করা। ইসলামি হুকুমত কিংবা ইসলামপন্থিরা ক্ষমতায় গেলে হুদুদ-কিসাস কায়েমের হুশিয়ারিপূর্ণ বজ্রকণ্ঠবাজির চেয়ে দুর্নীতির বিরুদ্ধে বজ্রকঠোর হওয়া উচিত ছিল। কারণ এই দুর্নীতিগ্রস্ততা মুসলিম বিশ্বের এক নাম্বার সমস্যা। প্রচলিত আওয়ামী লীগ-বিএনপির সঙ্গে ক্ষমতাকেন্দ্রিক লড়াই বাঁধানোর চেয়ে এসব দলের কেন্দ্রীয় স্থানীয় নেতৃবৃন্দের মাঝে ইসলামের দাওয়াত, ইসলামি আদর্শবাদিতা ও ধর্মীয় মূল্যবোধের প্রসার ঘটানো অধিক জরুরি ছিল। কিন্তু সেই মৌলিক কাজটি বাদ রেখে দুর্নীতিবাজদের সঙ্গে রাজনীতিক মৈত্রী কিংবা সুযোগ-সুবিধা পাওয়ার আশায় তাদের দরবারে ইসলামপন্থিদের ভক্তিপূর্ণ গমনাগমন ইসলামি মূল্যবোধসম্পন্ন যোগ্য নেতৃত্ব সৃষ্টির কাজে ব্যাপক বাধার সৃষ্টি করছে এবং ঠিক একারণেই বাংলাদেশ-পাকিস্তানে এরদুগান-মাহাথিরের মতো নেতৃত্বের শূণ্যতা বিরাজ করছে।

ওলামানেতৃত্ব পারস্পরিকভাবে এতোটা বিবেদপূর্ণ, কলহপ্রিয় এবং সংঘাতময় যে, অনেকেই নিজের প্রতিপক্ষের পেছনে জামায়াতে নামাযও পড়তে আপত্তি জানান। ভারতীয় স্বাধীনতা সংগ্রামের ভারতীয় কংগ্রেস ও মুসলিম লীগে দু’ভাগে বিভক্ত হয়ে পড়েছিলেন। মুসলিম লীগের সমর্থনকারীদের মধ্যে শিয়া, সুন্নি, দেওবন্দী, বেরলভী ও আহলে হাদীসপন্থি ওলামায়ে কেরামও ছিলেন। তাঁদের মধ্যে সবচেয়ে প্রভাবশালী আলেম ছিলেন হাকীমুল উম্মত হযরত আশরাফ আলী থানবী (রহ.)। মুসলিম লীগ হযরত থানবী (রহ.)-এর সমর্থন শুধু রাজনীতিক ছিল না, তিনি সেখানে ব্যাপক ধর্মীয় সংস্কারের প্রয়াস পেয়েছিলেন। ফলে মুসলিম লীগের জনসভাসমূহে নামাযের জামায়াত কায়েম হয়েছিল। কিন্তু বিপত্তির ব্যাপার হয়ে দাঁড়িয়েছিল কোন ফিরকা-মাযহাব বা চিন্তাধারার আলিমের ইমামতিতে নামায অনুষ্ঠিত হবে, তা নিয়ে সংঘাতের সৃষ্টি হতে চলেছিল। তখন বিভিন্ন ফিরকার অনুসারীগণ কায়েদে আযম মুহাম্মদ আলী জিন্নাহর মতো ব্যক্তির পিছনে নামায পড়তে রাজি ছিল, কিন্তু কোনোভাবেই ভিন্নমতাবলম্বী কোনো আলেমের পিছনে নামাযে সন্তুষ্ট ছিল না। বাংলাদেশের ইসলামি রাজনীতিতে বেরলবী মতাদর্শীদের উল্লেখযোগ্য অংশগ্রহণ বলতে তেমন নেই। ইসলামিক ফ্রন্ট নামে যে অনুল্লেখযোগ্য দলটি তাদের রয়েছে বাংলাদেশের ইতিহাসে অন্যান্য ইসলামপন্থিদের সাথে তাদের ঐক্যের কোনো নজির নেই। কিন্তু জাতীয় পার্টির নেতৃত্বে জাতীয় জোটের অধীনে ধর্মীয়ভাবে চরম সাংঘর্ষিক মতাদর্শের দুটো দলের মধ্যে সমন্বয় সাধিত হয়েছে। জাতীয় জোট প্রকারান্তরে বাংলাদেশ ইসলামিক ফ্রন্ট ও বাংলাদেশের খেলাফত মজলিসের মাঝে ঐক্যের সমন্বয়কের ভূমিকা রেখেছে।

এতে বোঝা গেল, নির্দিষ্ট ফিরকা-মাযহাব ও মতাদর্শের প্রতিনিধিত্বকারী ওলামায়ে কেরামের নেতৃত্ব একটি জাতীয় বিপ্লব সম্ভব নয়। এখানে নেতৃত্বকে অবশ্যই ফিরকা-মাযহাব ও মতাদর্শের ঊর্ধ্বে থাকতে হবে, ফিরকা-মাযহাবনিরপেক্ষ হতে হবে তাকে। কওমি মাদরাসার স্বীকৃতি দেয়া প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এবং আওয়ামী লীগের পক্ষে সম্ভব হয়েছে। এটি যদি জামায়াতে ইসলামী, ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ কিংবা ইসলামী ঐক্যজোটের সরকার হতো এবং তারা এই স্বীকৃতি প্রদান করতো তাহলে সম্ভবত এদেশের সুন্নি নামে আত্মখ্যাত আলিমরা রক্তগঙ্গা বইয়ে দিতে চেষ্টা চালাতেন! অতএব শরীয়া বাস্তবায়ন, বরং ইসলামি হুমুকত কায়েমেও সবচেয়ে কার্যকর নেতৃত্ব হচ্ছে এরদুগান-মাহাথিরদের নেতৃত্ব। আজকে ইসলামি আন্দোলনের অনেক কর্মিদেরকে রাজনীতিতে ফিরকাগত মাসআলা চর্চা করতে দেখা যায়, আহলে হাদীস, জাকির নায়েক কিংবা বেরলভী বিরোধিতা ঠিক রাজনীতিক মঞ্চ থেকে করা হয়ে থাকে। রাজনীতির মঞ্চেও যদি এসব চর্চা হওয়া লাগে তাহলে দেশের দারুল ইফতা, ইসলামি গবেষণা কেন্দ্র, মাদরাসা এবং ওলামায়ে কেরামের হালকাগুলো কোন কাজের? এসব নিয়ে অ্যাকাডেমিকভাবে পড়াশোনা হতে পারে, কিন্তু রাজনীতিক সংঘাতে এসবকে টেনে আনা কি সম্পূর্ণই বিভ্রান্তিকর নয়?

                                                                                                                                                                                                    লেখক ও গবেষক : মাও. ছগীর চৌধুরী